অফিস সহকারীর ফেসবুক পোস্টের কারণে ১৫ মাস কারাভোগ
১। সন্ত্রাস বিরোধী অধ্যাদশে, ২০০৮ রহিত করে সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ প্রনয়ণ করা হয়। আইনটি ১১ জুন ২০০৮ তারিখে কার্যকর হয়েছে মর্মে ধরে নেয়া হয়। এই আইনটি যুগোপযোগী করে প্রনয়ণ করার র্সবাত্মক চেষ্টা করা হয়। সন্ত্রাসী কাজের সংজ্ঞা, সন্ত্রাসী কাজে র্অথায়ন, নিষিদ্ধ সত্তার সদস্যপদ, অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, সহায়তা, প্ররোচণা, অপরাধীকে আশ্রয় প্রদান সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অধিকন্তু, সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদশে ব্যাংকের ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত বিধানাবলী সংযুক্ত করা হয়। এসব অপরাধরে বিচারের জন্য সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। সর্বশেষ তফসলি-২ এ ৫ টি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের তালিকা সংযুক্ত করা হয়।
২। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিরাজমান পরিস্থিতিতে এই আইনের বিধানাবলী কৌতূহল উদ্দীপক। কারণ, এই আইনে আন্তরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী র্কাযক্রমের বিচারের বিধানাবলী যুক্ত করা হয়ছে।ফলশ্রুতিতে আমি সবসময় এই আইনের কার্যকারিতা নিয়েও নানা পর্যায়ে আলোচনা পর্যালোচনায় আগ্রহী ছিলাম। এই আইনের ধারা ৯ (৩) ও ১২ এর অধীনে একটি মামলা আমার কাছে আসে। ২৭ নভম্বের ২০১৭ এ সংঘটিত ঘটনার জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখে রমনা মডলে থানায় দুজন ব্যক্তিকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের হয়। মামলার বষিয়বস্তু নিম্নরুপঃ
১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখে ডিএমপির ডিজিটাল ফরেনসিক টিম, সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম বিভাগ, কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের জনৈক উপ পুলিশ-পরিদর্শক রমনা মডেল থানায় এই মর্মে অভিযোগ দায়ের করেন যে, গ্রেফতারকৃত আসামী (১) মোঃ X ও (২) মোঃ Y জেলাঃ চাপাইনবাবগঞ্জ, বিগত ২৭ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে সরকারি ফেসবুক ব্রাউজ করার সময় দেখেন যে মোঃ X নামে ফেসবুক আইডি থেকে ‘মরতইে হবে যখন শহীদী মরণ দিও আমাকে পোস্ট’ শেয়ার করা হয়ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, উক্ত ফেসবুক আইডি থেকে নিষিদ্ধ সত্তা আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের নীতি আর্দশ সর্মথন করে পোস্ট শেয়ার,বিভিন্ন উসকানমিূলক ও জঙ্গিবাদী ছবি আপলোড করে জঙ্গিবাদ প্রচারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করে আসামীদ্বয়ের কর্মস্থলের অফিস কক্ষে তাদের গ্রেফতার করা হয় এবং তাদের হেফাজতে হতে সিম্ফোনি মোবাইল ফোন, গ্রামীন ফোন সিম র্কাড, বাংলালিংক সিম র্কাড, কম্পউিটারের সিপিইউ ও হাতে লেখা ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য জব্দ করেন। গ্রেফতার পরর্বতী সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম, ডিএমপি হেড কোয়ার্টারস এর পঞ্চম তলার ৫২৮ নং কক্ষে এসে আসামী মোঃ X এর ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড নিয়ে তার ফেসবুক আইডি থেকে ম্যাসেঞ্জারে নিম্নোক্ত কথোপকথন উদ্ধার করেনঃ
(১) আরে ভাই আমার তো ঘুম আসেনা, জিহাদের কথা মাথায় আসলে (২) আরে ভাই মুজাহিদ বাংলাদেশে আছে, ভাল করে খোজ কর যদি তালবোন হতে চাও (৩) তাই নাকি আমার বাড়ি ফরদিপুর, কিন্তু আমি ঢাকাতে আছি (৪) আরে ভাই আমরা মরতে হলে মরব আল্লাহর জন্য (৫) তাই নাকি আরে ভাই জিহাদের জন্য কোন বয়স আর দরকার নাই, আপনার কি ভয় হচ্ছে বয়স কম বলে (৬) ভাই আপনি জিহাদের জন্য প্রস্তুত আছেন কি, আপনি কি জানেন জিহাদ অনেক কাছে মনে হচ্ছে ? (৭) হে ভাই জসমিউদ্দিনের জন্য অনকে খারাপ লাগছে (৮) আমি মনে হয় জসিমউদ্দিনের লেকচার শুনছেন (৯) সুন্দর ভাই তালেবানের কোন খোঁজ জানেন কি ইত্যাদি কথোপকথন জব্দ করা হয়।
আসামী মোঃ X জিজ্ঞাসাবাদে জানায় সে তার কর্মস্থলে পিওন পদে র্কমরত। তার কোন এনড্রয়েড মোবাইল নেই। উক্ত অফিসে নির্বাহী অফসিার হিসাবে র্কমরত আসামী মোঃ Y এর কম্পিউটার ব্যবহার করে সে জঙ্গিবাদের প্রচারণা চালাত এবং আসামী মোঃ Y তার কাজে উৎসাহ প্রদান করত।
৩। ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখে আসামীদ্বয়কে বিজ্ঞ মূখ্য মহানগর হাকিম আদালত, ঢাকায় পুলিশ প্রহরায় প্রেরণ করা হয় এবং আসামীদ্বয়ের ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিজ্ঞ আদালত ৪ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখে বিজ্ঞ মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুনরায় ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবদেন করা হয়। বিজ্ঞ আদালত ১ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অতঃপর ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয় এবং ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার আবদেন জানানো হয়। আসামী মোঃ Y এর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিম্নে তুলে ধরা হলঃ
আমার বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জ। ইংরেজি ২০১৩ সালে ঢাকার ঢাকা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মার্স্টাস এ ভর্তি হই। মার্স্টাস এ পড়াকালীন T নামক অনলাইন পত্রিকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাই। আমার চাচাতো ভাই-------- মাধ্যমে নিয়োগ পাই। --------আমাকে নিয়োগ দেন।তিনি T এর মালিক ছিলেন। T মূলত বিএনপি ও জামাতের নিউজগুলো হাইলাইট করে প্রচার করত। T এর তখনকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ----- T এর পাঠক সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ফেসবুক পেজ এ নিউজ বুস্ট এর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৪ ইং সালে এ সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৭ সালের রমজান মাসে আমাকে ফেসবুক পেজ এর এডমিন করা হয়। T এ কাজ করার সুবাদে T এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ---- এর সাথে সুসর্ম্পক হয়। তিনি আমাকে বলেন এত টাকা বেতনে তোমাকে T এ রাখতে পারছি না। তুমি আমার আরেকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ কর। সে হিসাবে বর্তমান অফিসে এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগদান করি। যোগদানের পর নির্বাহী পরচিালক ও পিওন মোঃ X এর সাথে পরিচয় হয়। এই প্রতিষ্ঠানে এসে এদের একটি ফেসবুক পেজ খুলে দেওয়ার জন্য আমাকে বলে। আমি F ফাউন্ডেশন নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে দেই। এই পেজ এ প্রতিষ্ঠান কোথায় কোথায় সাহায্য করছে সেই সব ছবি আপলোড করা হত। অফিসের পিওন মোঃ X অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করে ফেসবুক চালাত। ইসমাইল ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহার করেও ফেসবুক চালাত। আমি সেটা জানতাম।
৪। আসামী মোঃ Y এর জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে কোন আদালতে যাওয়া ঠিক হবে সেই মর্মে এক সপ্তাহ চিন্তা ভাবনা করলাম। এডভোকেট নাসির, এডভোকেট আসাদ উদ্দিনসহ আরও কয়েকজনের সাথে পরার্মশ করলাম। সকলের পরামর্শ সাপেক্ষে মামলাটি দাখিল করি। প্রাথমিক শুনানিঅন্তে মাননীয় বিচারপতিগণ কেন আসামী মোঃ Y কে জামিন দেওয়া হবে না এই মর্মে সরকারকে কারণ দর্শানোর জন্য ৪ সপ্তাহের নোটিস (Rule) জারি করেন। বিষয়টি জটিল ভেবেও আমি হাল ছাড়িনি। আমার সহকারীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলাম। সে সাধ্যমত চেষ্টা করে শুনানির জন্য প্রস্তুত করল। আমি ০৩ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে শুনানির জন্য নির্দিষ্ট করতে mention slip জমা দিলাম। ৪ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে শুনানির জন্য নির্ধারিত হল। ০৭ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে প্রথম শুনানি শুরু হল। আমার বক্তব্য আমি উপস্থাপন করলাম। সরকার পক্ষ পরদিন তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য সময় প্রার্থনা করেন। মাননীয় আদালত তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। ৯ অক্টোবর থেকে ২৭ নভেম্বর সর্বমোট ৩৩ দিন শুনানির জন্য মামলাটি কার্যতালিকায় আসে। সিনিয়র বিচারপতি জামিন দিতে চাইলেও জুনিয়র বিচারপতি জামিন দিতে চান নাই। বিভিন্ন সময়ে অত্র মামলায় ৫টি সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিট দায়ের করি। নিম্নে আদালতের শেষ আদেশ, আসামী মোঃ Y এর সহ-পাঠ্য কার্যক্রমের স্বীকৃতি স্বরুপ বিভিন্ন সনদপত্র, পত্রিকার রিপোর্ট, পত্রিকার অনুমোনদন সংক্রান্ত কাগজপত্র, F ফাউন্ডেশনের দলীলপত্র মাননীয় আদালতের সামনে বিভিন্ন তারিখে দায়ের করি। এসকল কাগজপত্র দেখে সিনিয়র বিচারপতি সন্তুষ্ট হন কিন্তু জুনিয়র বিচারপতি কোন ভাবেই জামিনে দিতে রাজি হননি। সবশেষে ২৬ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে আমি আমার যুক্তিতর্ক পেশ করি এবং আদালতের অবস্থাদৃষ্টে আমার মাঝে আশার সঞ্চার হয়। পরদিন ২৭ তারিখ রায়ের জন্য নির্ধারিত হয়। রায় শোনার জন্য আমি আদালতে উপস্থিত হই। মাননীয় বিচারপতি রায় ঘোষণার জন্য মামলার নথি গ্রহণ করেন এবং আমাকে বলেন “Learned counsel, we will not grant bail. We want to pass a direction upon the investigating officer to complete investigation within four months from the date of the receipt of the judgment; failing which the prayer for bail of the petitioner would be considered.” আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ডায়াসে দাড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি নট প্রেসড করে দিব কিন্তু কিছু কথা বলব। আমি আদলতকে সম্বোধন করে বললাম, “My Lords, আমি তার নিযুক্ত আইনজীবী। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি আপনাদের সামনে মামলাটি উপস্থাপন করার। আপনারা যখন যা বলেছেন আমি তাই যোগাড় করার চেষ্টা করেছি। আদালতে উপস্থাপন করেছি। একজন আইনজীবী হিসাবে আমার পক্ষে এর চেয়ে বেশি আর কিছু করার ছিলনা। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব, হয়ত কোন একদিন সফল হব। এটাই আমার পেশা। আমি নট প্রেস করছি।”
সিনিয়র বিচারপতি অধির আগ্রহে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোর্ট ভর্তি আইনজীবীরা পিনপতন নিরবতায় শুনলেন। আমি Much obliged to your Lordships বলে আদালত কক্ষের বাইরে আসলাম। ওই দিন বিকাল বেলা একজন মহিলা আইনজীবী এনেক্স ভবনের ১৯ নং কোর্টের সামনে আমাকে বলেন “আমি ওই দিন এনেক্স ৮ নং কোর্টে ছিলাম। আমি আপনার কথায় আবেগ প্রবণ হয়ে গেছিলাম। আসলে বেইলটি দেওয়া উচিত ছিল। চালিয়ে যান।এটাই এই পেশার সৌন্দর্য।”
৫। এই ঘটনায় বেশ কয়েকরাত আমি ঘুমাতে পারিনি। মোঃ Y এর পরিবার বারবার জিজ্ঞাসা করছিল যে, এরপর আমরা কি করব। আমি নিম্ন আদালতের বিজ্ঞ আইনজীবী এডভোকেট রোকন রেজা শেখ-কে ফোন করে পুনরায় প্রস্তুতি নিতে বললাম। তিনি সি আর মিস মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিলেন। সকল প্রক্রিয়া শেষ করে তিনি ৩ মাস পর আবার একসেট সার্টিফাইট কপি আমার কাছে পাঠালেন। সার্টিফাইড কপি পেয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পুনরায় একই আদালতে যাব। মামলা প্রস্তুত করে দায়ের করলাম। Unlisted motion হিসাবে শুনানি করলাম। সিনিয়র বিচারপতি পরের দিন আদেশের জন্য রাখলেন। সেদিন ছিল সোমবার। পুনরায় আমি আমার বক্তব্য তুলে ধরলাম। রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করল। কিন্তু জুনিয়র বিচারপতি কোন আপত্তি উপত্থাপন করেননি। মাননীয় বিচারপতি সন্তুষ্ট হয়ে ২০ মে ২০১৯ জামিন মঞ্জুর করলেন। আমার মাথা থেকে একটি পাথর নেমে গেল। শুকরিয়া আদায় করলাম এবং সাথে সাথে আপীল বিভাগে কেভিয়েট দায়ের করলাম। কিন্তু সরকার আপীল ফাইল করে নাই।
৬। ২৮ মে ২০১৯ তারিখে জামিনের আদেশ নিম্ন আদালতে শামিল হল। দু দিন পর মোঃ Y এর আমাকে ফোন করল। বিলম্বের কারণে আমি তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করলাম। সে উল্টো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আজও সেই মধুর স্মৃতি আনন্দ দেয়।