Research

মেডিকো-লিগ্যাল সিরিজ (পর্ব-১): বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আইনি কাঠামো

15 June 2021

মুখবন্ধ

১৭ অক্টোবর ২০২০ রোজ শনিবার। জাতীয় দৈনিকগুলোতে ‘জীবিত নবজাতককে মৃত ঘোষণা’ মর্মে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিস্তারিত তথ্য চেয়ে হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করি। মেডিকেল কলেজের পরিচালক এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সাথে সামনাসামনি আলাপ হয়। একজন প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তির সাথে আলাপে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র উঠে আসে। চিকিৎসা অবহেলার (Medical Negligence) প্রসঙ্গ আসতেই তিনি বেশ উষ্মা প্রকাশ করেন। পাশেই বসা ছিলেন একজন বিভাগীয় প্রধান। তিনি বিনয়ের সাথে বললেন ‘‘ যান, পুরো ঢাকা মেডিকেলটা একটু ঘুরে আসুন, বারান্দায় আর ফো¬রে শুয়ে থাকা রোগীদের দৃশ্য দেখলে এই কথাটা বলতেন না”, আরো বললেন ‘‘ আপনারা কি মনে করেন না, আমরাও (ডাক্তার) চাই একজন রোগী হাসপাতালে এসে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা সহ চিকিৎসা গ্রহণ করুক? চিকিৎসা শেষে যথাযথভাবে আমরা তাকে হাসিমুখে বিদায় দিব, কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?”। প্রশাসনিক জটিলতা, হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা, রোগীর অত্যধিক চাপ, দুর্বল ব্যবস্থাপনাসহ অনেক বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরলেন। মনের অজান্তেই আমি তাঁর সাথে একমত হয়ে গেলাম। কারণ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র হিসেবে ঢাকা মেডিকেলের এই দৃশ্য আমাদের কাছে মোটেও অপরিচিত নয়।

এছাড়াও চিকিৎসক বন্ধুদের কাছে তিক্ত অভিজ্ঞতার নানান গল্প শুনি। অবাক বিস্ময়ে নিজেকেই প্রশ্ন করি, পাহাড়সম এই সমস্যার সমাধান সত্যিই কি সম্ভব? কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সুরক্ষার অভাব, বিএমডিসির নিস্ক্রিয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, চাকুরির অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা, পদোন্নতি, হাসপাতালে আক্রমণ, ফরমায়েশি মেডিকেল রিপোর্ট প্রদানে বাধ্য করা, রাজনৈতিক হেনস্থাসহ বিস্তর অভিযোগ। চিকিৎকের উপর হামলা, হত্যা মামলা দায়ের এবং পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে। অপরদিকে রোগীদের পক্ষ থেকে চিকিৎসক ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। চিকিৎসায় অবহেলা, রূঢ় আচরণ, অধিক ফি’গ্রহণ, প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামের অভাবসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগী ও চিকিৎসকদের মাঝে সম্পর্কের টানাপোড়ন বিদ্যমান। অথচ আস্থাই হলো ডাক্তার রোগীর সম্পর্কের ভিত্তি। এহেন অবস্থা একদিনে তৈরী হয়নি, উত্তরণও একদিনে সম্ভব নয়। উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যেমন দরকার, জনসাধারণের সচেতনতাও সমভাবে প্রযোজ্য। সরকার বিভিন্ন মেয়াদী কর্মসূচী হাতে নিয়েছে এবং আইন প্রণয়ন করার চেষ্টাও করেছে। তবুও সংকট কাটেনি। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের যথাযথ বাস্তবায়ন।

হয়তো আপনারা অনেকেই আইনের নানান মারপ্যাঁচ সম্পর্কে অবগত আছেন। চিকিৎসা পেশা সংক্রান্তে বেশ কয়েকটি আইন, আচরণ বিধি ও নীতিমালা ইতমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। যথা, Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982; বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০; স্বীকৃত মেডিকেল চিকিৎসক ও ডেন্টাল চিকিৎসকদের জন্য অনুসরণীয় পেশাগত আচরণের মান ও তৎসম্পর্কিত নীতি নির্ধারণ ২০১৪; জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, ২০১১; বিদেশী বিশেষজ্ঞ ডাক্তার/বিশেষায়িত নার্স আগমন সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১৮ এবং দুটি খসড়া (আইন) যথাক্রমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন ও ২০১৪ এবং স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা আইন, ২০১৮। এর বাইরেও বাংলাদেশের দন্ডবিধিতে অবহেলা জনিত মৃত্যু ঘটানোর শাস্তি উল্লেখ আছে। এ সংক্রান্তে দেশের উচ্চ আদালত কর্তৃক বেশ কিছু সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে। বিস্তারিত দ্বিতীয় কিস্তিতে আলোচনা করা হবে।

signature
15 June 2021